ঢাকায় নজরুল
“সেই আমি প্রথম দেখলাম নজরুলকে, অন্য অনেক অসংখ্যের মতোই দেখামাত্র প্রেমে পড়ে গেলাম। চওড়া কাঁধে বলিষ্ঠ তাঁর দেহ, মাঝখান দিয়ে সোজা-সিঁথি-করা কোঁকড়া চুল গ্রীবা ছাপিয়ে প্লাবিত, মুখখানা বড়ো ও গোল ছাঁদের, নেত্র আয়ত ও কোণ রক্তিম। গায়ে গেরুয়া রঙের খদ্দর পাঞ্জাবি, কাঁধে সূর্যমূখী হলুদ চাদর। কণ্ঠে তাঁর হাসি, কণ্ঠে তাঁর গান, প্রাণে তাঁর অফুরান আনন্দ—সব মিলিয়ে মনোলুন্ঠনকারী একটি মানুষ। তাঁর জন্য আমি জগন্নাথ হল-এ যে-সভাটি আহ্বান করেছিলাম তাতে ভিড় জমে ছিল প্রচুর। দূর শহর থেকে ইডেন কলেজের অধ্যাপিকারাও এসেছিলেন, তাঁর গান ও কবিতা আবৃত্তি শুনে সকলেই মুগ্ধ: মৃত অথবা বৃদ্ধ অথবা প্রতিষ্ঠানীভূত না-হওয়া পর্যন্ত কবিদের বিষয়ে, যাঁরা স্বাস্থ্যকরভাবে সন্দিগ্ধ, সেই প্রাজ্ঞদেরও মানতে হয়েছিল যে লোকটার মধ্যে কিছু আছে।”
সে-যাত্রায় আমার নজরুল-সংসর্গ সেখানেই অবশ্য শেষ হয়নি। তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলাম সবান্ধবে আমার পুরানো পল্টনের বাড়িতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিংহদ্বারে এক অধ্যাপক ভবনে তাঁকে গান রচনা করতে দেখেছিলাম। তাঁর স্বকণ্ঠে তাঁর গান যাঁরা শুনেছেন, তাঁর রচনা-প্রক্রিয়ার দর্শক ছিলেন যাঁরা, শুধু তারাই জানেন নজরুলের পক্ষে গান জিনিসটা কত সত্য ছিল। কত স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত। একটি হার্মোনিয়াম, প্রচুর পরিমাণে পান এবং ঘণ্টায় ঘণ্টায় চা: এই উপকরণ নিয়ে তিনি সারাদিন ধরে গেয়ে যেতে পারেন— অনুরোধের অপেক্ষা না রেখে, প্রাণের আবেগে, অক্লান্তভাবে, মাঝে মাঝে শ্রোতাদের দিকে দৃষ্টিবাণ হেনে কোন বিশেষ পঙক্তি বা শব্দবন্ধে এসে অকস্মাৎ গলা ছেড়ে হেসে উঠে। গাইয়ের মাজা গলা নয় তাঁর, বরং একটু ভাঙা-ভাঙা, কিন্তু সেই ত্রুটি বিপুল ভাবে পুষিয়ে দেয় তার অপর্যাপ্ত বাধাবন্ধহীন উৎসাহ। আর গীতরত নজরুলকে শ্রবণ এবং দর্শন করে আমরা আরো বেশি আনন্দ পাই এই কারণে যে সেই নবোদ্ভূত নবরসান্বিত গজলগুচ্ছের প্রতিটি পঙক্তি ‘কল্লোলে’র পৃষ্ঠা থেকেই আমাদের মুখস্থ, ‘কল্লোল’-গোষ্ঠীর মুখে মুখে সেগুলি সুরে-বেসুরে আবর্তিত হয়ে থাকে। যেমন তাঁর গান গাওয়া নিষ্কুণ্ঠ তেমনি তাঁর রচনাও এক প্রকাশ্য ঘটনা: সৃষ্টিকর্মটি যে নির্জনতা দাবি করে ব’লে আমরা চিরকাল শুনে এসেছি, তার তোয়াক্কা রাখে না নজরুল, ঘর-ভর্তি লোকের উপস্থিতি তাঁকে বিব্রত করেনা মুহূর্তের জন্য বরং অন্যদের চোখে-চোখে তাকিয়ে হাসির উত্তরে হাসি ফুটিয়ে, তিনি যেন নতুন প্রেরণা সংগ্রহ করেন। সামনে হার্মোনিয়াম, পাশে পানের কৌটা, হার্মোনিয়ামের ঢাকনার উপরে খোলা থাকে তাঁর খাতা আর ফাউন্টেনপেন—তিনি বাজাতে-বাজাতে গেয়ে উঠলেন একটি লাইন, তাঁর বড়ো-বড়ো সুগোল অক্ষরে লিখে রাখলেন খাতায়, আবার কিছুক্ষণ বাজনা শুধু—দ্বিতীয় লাইন—তৃতীয়—চতুর্থ—দর্শকদের নীরব অথবা সরব প্রশংসায় চর্চিত হ’য়ে ফিরে-ফিরে গাইলেন সেই সদ্যরচিত স্তবকটি এমনি ক’রে, হয়তো আধ ঘণ্টার মধ্যে ‘নিশিভোর হ’লো জাগিয়া পরান-পিয়া’ গানটি রচনা করতে আমি তাঁকে দেখেছিলাম—দৃশ্যটি আমার দেবভোগ্য ব’লে মনে হয়েছিলো। ‘প্রগতি’তে প্রকাশিত নজরুলের লেখা সেই গানটাই বোধ হয় প্রথম।”
আমার যৌবন, বুদ্ধদেব বসু, পৃ. ৭-৯
বুদ্ধদেব বসু
সাহিত্যজগতে অনন্য প্রতিভা। সবসময়ই নিজের লেখা দিয়ে পাঠকের মন ছুঁয়েছেন, ভাবনা জাগিয়েছেন ভিন্নতার। মফস্বলে বেড়ে ওঠা। নিত্য দিনের জীবন থেকেই লেখার অনুপ্রেরণা খুঁজে নিয়েছেন। প্রকাশনার ক্ষেত্রে নতুন হলেও তাঁর হৃদয়গ্রাহী বর্নণার মাধ্যমে জীবন, প্রকৃতির জীবন্ত এক চিত্রই পাঠকের সামনে হাজির করেন।
-
বাংলাদেশ ছিল নদীমাতৃক। নদী ছিল বাংলার জীবনযাত্রার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু আজ যে-টুকু বাংলা আমাদের, সে বাংলা তেমন নদীবহুল নয়। যে-অংশ নদীবহুল এবং নদীর খেয়ালখুশীর সঙ্গে যে অংশের মানুষের জীবনযাত্রা একসূত্রে বাঁধা সে অংশ আজ আমাদের কাছে বিদেশ। অদৃষ্টের এ পরিহাস রবীন্দ্রনাথের কাছে ভয়ানক দুঃখের কারণ হত।
প্রকৃতি রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্ট করেছিল। সেদিক থেকে তিনি ওয়ার্ডসওয়ার্থের সগোত্র ছিলেন। কিন্তু প্রকৃতির বিভিন্ন প্রকাশের মধ্যে নদী কবিকে বোধহয় সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ ক’রেছিল। তাই কবি নদীর কাছে সময়ে অসময়ে ছুটে গেছেন। তাই তিনি নদীর বুকে নৌকাতে ভাসতে এত ভালবাসতেন। নদীর তরুণীসুলভ চাপল্য এবং গতি কবির চিরতরুণমনে গভীর দাগ কেটেছিল। তাছাড়া সংসারের কোলাহল থেকে মুক্তি
-
তপুকে আবার ফিরে পাব, এ কথা ভুলেও ভাবিনি কোনোদিন। তবু সে আবার ফিরে এসেছে আমাদের মাঝে। ভাবতে অবাক লাগে, চারবছর আগে যাকে হাইকোর্টের মোড়ে শেষবারের মতো দেখেছিলাম, যাকে জীবনে আর দেখব বলে স্বপ্নেও কল্পনা করিনি- সেই তপু ফিরে এসেছে। ও ফিরে আসার পর থেকে আমরা সবাই যেন কেমন একটু উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। রাতে ভালো ঘুম হয় না। যদিও একটু-আধটু তন্দ্রা আসে, তবু অন্ধকারে হঠাৎ ওর দিকে চোখ পড়লে গা হাত পা শিউরে ওঠে। ভয়ে জড়সড় হয়ে যাই। লেপের নিচে দেহটা ঠক্ ঠক্ করে কাঁপে।
দিনের বেলা অনেকেই আমরা ছোটখাটো জটলা পাকাই।
দিনের বেলা ওকে ঘিরে দেখতে আসে ওকে। অবাক হয়ে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.
Featured News
Advertisement
-
welcome
- by Shamim Ahmed Chowdhury
- ১৫ Jan ২০২৬
-
Thank you
- by bappi
- ১৫ Jan ২০২৬
-
good
- by Shamim Ahmed Chowdhury
- ১৫ Jan ২০২৬
Comments